শতকোটি টাকার দুর্নীতির জাল ও ক্ষমতার অপব্যবহার
বিশেষ প্রতিবেদক: গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বদলি-বাণিজ্য ও অবৈধ কমিশন আদায়ের পাহাড়সম অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নানা প্রকল্প থেকে অনৈতিক সুবিধা আদায় এবং কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে গত কয়েক মাসেই তিনি প্রায় ১২২ কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জন করেছেন বলে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা দেওয়া অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। কেবল আর্থিক দুর্নীতিই নয়, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি গণপূর্তে এক বিশাল সিন্ডিকেট সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন।
পরকীয়া ও অনৈতিক সম্পর্ক: নারীদের ব্যবহার করে প্রশাসনিক প্রভাব
বদরুল আলম খানের ব্যক্তিগত জীবন ঘিরে রয়েছে একের পর এক নারীঘটিত অনিয়মের অভিযোগ। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি একাধিক নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িত এবং একাধিক বিয়ে করেছেন। জনসমক্ষে আসা বিভিন্ন ছবি, অডিও ও ভিডিওর সূত্রে জানা যায়, তিনি পরিচিত নারীদের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকর্তার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতেন। পরবর্তীতে সেই সব যোগাযোগ ও সম্পর্ককে হাতিয়ার বানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেন এবং নিজ স্বার্থে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিতেন।
২৫ বছরের সংসারে চরম অবহেলা ও প্রথম স্ত্রীর অভিযোগ
প্রথম স্ত্রী মিসেস জেসমিনের অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘ ২৫ বছরের দাম্পত্য জীবনে তিনি স্বামীর কাছ থেকে চরম মানসিক অবহেলা ও নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। তিন সন্তানের দায়িত্ব একা তাঁকেই সামলাতে হয়েছে। পারিবারিক এই বিশৃঙ্খলার কারণে তাঁদের ছোট মেয়েও সামাজিকভাবে ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশ হওয়া ঢাকার হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক নথি থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি অসুস্থ জেসমিন হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নেন। অভিযোগকারীরা জানান, প্রথম স্ত্রী যখন গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, তখনও বদরুল আলম খান তাঁর পাশে না থেকে অন্যত্র অবস্থান করছিলেন।
টেন্ডার সিন্ডিকেট, ভুয়া সনদ ও কর্মকর্তাদের ব্ল্যাকমেইলিং
নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও দরপত্র প্রক্রিয়ায় সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। ভোলা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লার কয়েকজন প্রভাবশালী ঠিকাদারকে নিয়ে তিনি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।
কুমিল্লার এক দরপত্রে ভুয়া সনদধারী ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে চাপ সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। 'আসিফ' নামের এক ঠিকাদারকে পুলিশের একাধিক থানা ভবন নির্মাণের কাজ পাইয়ে দিতে প্রভাব খাটান।
মিরপুরের পাইকপাড়া আবাসিক প্রকল্পের কাজ বিধবহির্ভূতভাবে অন্য বিভাগের মাধ্যমে দরপত্র আহ্বানের ব্যবস্থা করেন।
পুলিশের ১০৭ থানা নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ভাষানটেক থানা ভবন নির্মাণের কাজ পছন্দের ঠিকাদারকে না দেওয়ায়, এক নির্বাহী প্রকৌশলীকে নারী দিয়ে ব্ল্যাকমেইলিং করার চেষ্টা চালানো হয়। তাতে ব্যর্থ হয়ে পরবর্তীতে ওই কর্মকর্তাকে নারীঘটিত মিথ্যা ঘটনায় জড়িয়ে শাস্তির মুখে ফেলেন তিনি।
বেনামে ১২২ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ
আইনি ঝামেলা এড়াতে অবৈধ অর্জনের ১২২ কোটি টাকা নিজের নামে না রেখে আত্মীয়স্বজনের নামে রূপান্তর করেছেন বদরুল আলম। অনুসন্ধানে তাঁর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট, গ্রামের বাড়ীতে বিলাসবহুল নির্মাণ, খামারবাড়ি, বিভিন্ন ব্যাংকে সঞ্চয় এবং ডেভেলপার ব্যবসায় বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে রাজস্ব ফাঁকি দিতে আয়কর নথিতে প্রকৃত সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগও করা হয়েছে।
বেপরোয়া বদলি-বাণিজ্য,
ওএসডি রেকর্ড ও কর্মস্থলে বিশৃঙ্খলা প্রশাসনিক পদে বদলির ক্ষেত্রেও অনৈতিক প্রভাব খাটান তিনি। গত ৩ ফেব্রুয়ারি সাভার সার্কেল থেকে ঢাকা গণপূর্ত-১ সারকেলে বদলির সময় অন্য কর্মকর্তার নাম সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতা দেখিয়ে নিজের পছন্দসই পদায়ন বাগিয়ে নেন। এর আগেও ময়মনসিংহে কর্মরত থাকাকালে ভবনের নকশা অনুমোদনে অনিয়মের দায়ে তাঁকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছিল। দপ্তরের এক নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, বদরুল আলম খান দাপ্তরিক দায়িত্ব অবহেলা করে কর্মস্থলে নারীদের নিয়ে সময় কাটাতেন এবং অফিসে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতেন।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি:
অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।