৪৩০ কোটি টাকার হাওড় প্রকল্পে দুর্নীতি-অনিয়মের গুরুতর অভিযোগের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদক |
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রকল্প বাস্তবায়নে ‘প্রভাব’ নামক অলৌকিক শক্তির ছায়ায় ঢাকা পড়েছে আইন-কানুন ও সুশাসন। হাওড় অঞ্চলের শিক্ষা প্রসারে ৪৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৫টি বহুতল ভবন নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) এবং ইইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শাহজাহান আলীর বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার অনুমোদন, ঠিকাদারি সিন্ডিকেশন এবং অভ্যন্তরীণ নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি স্বপদে বহাল হয়েছেন। প্রশাসনিক তদন্ত ও সাময়িক অপসারণের মাত্র ১৮ দিনের মাথায় রহস্যজনক আদেশে তাকে পুনরায় ক্ষমতার কেন্দ্রে আসীন করা হয়েছে, যা অধিদপ্তরজুড়ে তৈরি করেছে চরম তোলপাড়।
অনিয়মের পাহাড় ও কোটি টাকার হাওড় প্রকল্প
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত হাওড় অঞ্চলের এই প্রকল্পটি দেশের পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ শিক্ষার পরিবেশ তৈরির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে সরকারি তহবিল ও জনগণের করের টাকায় পরিচালিত এই প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে শাহজাহান আলীর বিরুদ্ধে চার ধরণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে। প্রথমত, প্রকল্পের চারশত ত্রিশ কোটি টাকা থেকে সরাসরি আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাৎ। দ্বিতীয়ত, হাওড় অঞ্চলের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জীবন ঝুঁকিতে ফেলে ভবনে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের অনুমোদন প্রদান। তৃতীয়ত, উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়াকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজস্ব বলয়ের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে ‘সিন্ডিকেশন’ গড়ে তোলা। এবং চতুর্থত, অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ কর্মী পদায়ন ও স্থানান্তরে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের বাণিজ্য পরিচালনা করা।
আওয়ামী লীগ আমল থেকে পটপরিবর্তন: অধরা প্রভাবশালী
শাহজাহান আলীর এই অপতৎপরতা নতুন নয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রংপুর অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করার সময়ও তার বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রামাণ্য অভিযোগ ছিল। কিন্তু তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে তিনি বরাবরই পার পেয়ে যান। ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশজুড়ে যখন প্রশাসনিক সংস্কার ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের অপসারণ শুরু হয়, তখনও শাহজাহান আলী রহস্যজনক কারণে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার ‘গুড লিস্টে’ স্থান করে নেন। একাধিক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো এক অদৃশ্য ক্রস-পার্টি ক্ষমতার বলে তিনি অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে নিজের একক আধিপত্য ধরে রাখতে সক্ষম হন।
২৩ জুলাইয়ের ওএসডি ও তদন্ত কমিটি
গণমাধ্যম ও প্রশাসনিক অঙ্গনে তার দুর্নীতির চিত্র উঠে এলে বাধ্য হয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয় কর্তৃপক্ষ। গত ২৩ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উন্নয়ন-৩ শাখা থেকে এক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে শাহজাহান আলীকে ইইডির প্রধান কার্যালয় থেকে অপসারণ করে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে বদলি করা হয়। একই সাথে তার বিরুদ্ধে ওঠা চারটি প্রধান অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ৩ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে মাত্র ১০টি কর্মদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
১২ আগস্টের রহস্যময় প্রজ্ঞাপন
তদন্ত শুরু হতেই নজিরবিহীন প্রশাসনিক নাটকীয়তার সূচনা হয়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলাকালে তাকে ওএসডি রাখা বাধ্যতামূলক, যাতে তিনি তদন্ত প্রভাবিত করতে না পারেন। কিন্তু এই সাধারণ নিয়ম ভেঙে দেওয়া হয় মো. শাহজাহান আলীর ক্ষেত্রে। ওএসডি আদেশের মাত্র ১৮ দিনের মাথায়, অর্থাৎ ১২ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-৩ শাখার উপসচিব এ এস এম শাহরিয়ার জাহান স্বাক্ষরিত এক নতুন প্রজ্ঞাপনে শাহজাহান আলীর ওএসডি আদেশ বাতিল বা স্থগিত করে তাকে পুনরায় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে আসীন করা হয়। ১০ কর্মদিবসের তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেছে কি না, শাহজাহান আলী নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন কি না—তার কোনো তথ্য প্রকাশ না করেই এই দ্রুততম পুনর্বহাল সম্পন্ন করা হয়।
অধিদপ্তরে চরম ক্ষোভ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট
কোনো প্রকাশ্য ব্যাখ্যা বা তদন্ত প্রতিবেদন ব্যতিরেকে অভিযুক্ত কর্মকর্তার এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তনে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রশ্ন তুলছেন, কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একজন কর্মকর্তা এত দ্রুত ক্ষমতায় ফিরতে পারেন? এতে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কর্মপরিবেশ ও নৈতিক শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে পড়েছে।
প্রশাসনিক নীতি ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
সুশাসন ও প্রশাসনিক নীতি অনুযায়ী স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা হলো যেকোনো সরকারি সংস্থার প্রধান ভিত্তি। ৪৩০ কোটি টাকার হাওড় প্রকল্পে যে নিম্নমানের উপকরণের অভিযোগ উঠেছে, তা দীর্ঘমেয়াদে নির্মাণাধীন ভবনের স্থায়িত্ব এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরণের ঝুঁকিসমূহ তৈরি করেছে।
বিভিন্ন সুশাসন বিশেষজ্ঞ ও সিভিল সোসাইটির মতে, ওএসডি প্রত্যাহার ও পুনর্বহালের পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল অস্পষ্ট ও প্রভাবনির্ভর। এই মুহূর্তে শাহজাহান আলীর তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করা, OSD স্থগিতের নিরপেক্ষ কারণ ব্যাখ্যা করা এবং পুরো ঘটনার পুনর্বিবেচনার জন্য একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। নতুবা সরকারি তহবিলের অপচয় এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর থেকে জনগণের আস্থা পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
এবিষয়ে বক্তব্য জানতে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শাহজাহান আলীর নাম্বারে যোগাযোগ করলেও কেউ ফোন ধরেননি।